I'm

Md Abu Taher

Social Worker, Chairman Candidate, Consultant, Businessman, Political Person, Public Figure

Abu Taher
Dummy Image

শ্রাবণের স্ফুলিঙ্গ ও এক অচেনা বীর

Date : Sept. 16, 2026, 6:04 p.m.

Blogger Name: আবু হাসান তাহের

শ্রাবণের স্ফুলিঙ্গ ও এক অচেনা বীর

আবু হাসান তাহের

---------------------------

• জুলাইয়ের তপ্ত রোদে তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথ যেন এক আগ্নেয়গিরি। শহিদ মিনার চত্বরে হাজারো শিক্ষার্থীর উত্তাল তরঙ্গ। সেই উত্তাল তরঙ্গের ঠিক মোহনায়, একহাতে মাইক শক্ত করে ধরে বজ্রকণ্ঠে স্লোগান দিচ্ছিলেন ইব্রাহিম হোসেন রনি—"কোটা না মেধা? আপস না সংগ্রাম? দালালি না রাজপথ?"

শার্টের হাতা গোটানো, কপালে লেপ্টে থাকা ঘাম আর চোখে একবুক সাহসের জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ। রাজপথে তার সেই অকুতোভয় নেতৃত্ব দেখে ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে বানিয়েছিল তাদের একছত্র ভরসার কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু এই রাজপথের বীর রনিকে যারা সেদিন চিনেছিল, তারা জানত না তার পেছনের দীর্ঘ ও বিভীষিকাময় সংগ্রামের কথা। রনির শরীরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগুণতি কালো দাগ আর ক্ষতচিহ্নগুলো ছিল বিগত সরকারের অন্ধকূপ, রিমান্ড কক্ষ আর ছাত্রলীগের অমানুষিক নির্যাতনের নীরব সাক্ষী।

বছর দুয়েক আগের এক অন্ধকার রাতের কথা। ক্যাম্পাস সংলগ্ন একটি মেসে পড়ার টেবিলে বসে ছিলেন রনি। হঠাৎ একদল অস্ত্রধারী ক্যাডার আর পুলিশের টিম একসাথে দরজায় চড়াও হয়। কোনো পরোয়ানা ছাড়া, কোনো কথা না শুনেই তাকে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় থার্ড ডিগ্রির অন্ধকূপে।

গোয়েন্দা পুলিশের অন্ধকার রিমান্ড কক্ষে টানা তিন দিন চলেছিল অমানুষিক নির্যাতন। সিলিংয়ের সাথে দু'হাত ঝুলিয়ে রেখে ভারী লাঠি দিয়ে পেটানো হতো তাকে।

"বল, তোর পেছনে কে আছে? তোদের ফান্ড কোত্থেকে আসে?"—তদন্তকারী কর্মকর্তার হুংকারের জবাবে রনির মুখ থেকে শুধু বের হতো, "আমি সাধারণ ছাত্রদের জন্য কথা বলি। সত্যের পথে থাকার জন্য কারও ফান্ডের দরকার হয় না।"

উত্তর শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে টেবিলের ওপর রনির আঙুল চেপে ধরে বুট জুতো দিয়ে পিষে দেওয়া হয়েছিল। ব্যথায় চেতনা হারিয়ে ফেলার পরও স্যালাইন দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হতো, শুধু আবারও নির্যাতন করার জন্য। রিমান্ডের সেই নরকযন্ত্রণা আর জেলের অন্ধকূপ রনির দেহতন্তুকে ভেঙে তছনছ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার ভেতরের ইস্পাতকঠিন ইমান আর আত্মবলকে এতটুকু টলাতে পারেনি। জেলে বন্দি অবস্থায় দীর্ঘ সময় তিনি শুধু স্রষ্টার দরবারে ধৈর্য ও শক্তির প্রার্থনা করেছিলেন।

জেল থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার পরও ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনীর হুমকি থামেনি। কিন্তু রনি দমে যাননি। জুলুম আর অত্যাচার যাকে ভাঙতে পারেনি, তাকে তো কোনো শক্তিই থামাতে পারে না!

জুলাই আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক দিনে, বিগত এক যুগ ধরে ক্যাম্পাসে চেপে বসা ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব ভাঙতে শুরু করে রনির এক দুঃসাহসী নেতৃত্বে। মিছিলের সামনে বুক চিতিয়ে রনি মাইকে গর্জে উঠলেন—"ছাত্রলীগের ভাইয়েরা, এখনও সময় আছে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান! সাধারণ ছাত্রদের ক্যাম্পাস ছাত্রদের কাছে ফিরিয়ে দিন! আমরা আসছি ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্য!"

রনির সেই ইস্পাতকঠিন কণ্ঠ আর তার পেছনে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অপ্রতিরোধ্য পদভারে থমকে গিয়েছিল ক্যাডার বাহিনী। যাদের হাতে একসময় রনি নির্যাতিত হয়েছিলেন, তারা রনির এই নৈতিক বল আর সাহসের সামনে টিকতে না পেরে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে গেল। চবি ক্যাম্পাস মুক্ত হলো, সাধারণ ছাত্ররা দীর্ঘ এক যুগ পর বুক ভরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। পরবর্তীতে আন্দোলন সফল হলে রনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটে চবির ছাত্র সংসদের ভিপি (চাকসু ভিপি) নির্বাচিত হন।

আন্দোলন-পরবর্তী চবি ক্যাম্পাসে রনির জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের কাছে রনি ছিলেন চরম এক শ্রদ্ধার ও আকর্ষণের নাম। চবি ক্যাম্পাসে বের হলেই তাকে ঘিরে ধরত শিক্ষার্থীদের দল, চলত সেলফি তোলার হিড়িক। কিন্তু রনির এই বাহ্যিক জনপ্রিয়তা আর নেতৃত্বের অন্তরালে যে দীর্ঘদিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ, পরহেজগারি আর শৃঙ্খলা ছিল—তা তখনও অচেনাই রয়ে গিয়েছিল অনেকের কাছে।

এক রাতে, রাজপথের সহযোদ্ধা ও বন্ধু সৈকত আর রনি একসাথে জিরো পয়েন্টের চায়ের দোকানে বসে ছিল। আন্দোলনের নানা স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা হচ্ছিল। কথার মাঝেই হঠাৎ রনির ফোনের অ্যালার্ম বেজে উঠল। স্ক্রিনে একটা চ্যাট গ্রুপের নোটিফিকেশন আসতেই রনি খুব নম্রভাবে ফোনটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়াল, "সৈকত, আজ এখানেই উঠি। এশার সালাতের সময় পার হয়ে যাচ্ছে, আর আমার অধ্যায়ন চ্যাপ্টারের কিছু পড়া বাকি আছে।"

সৈকত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে জানে, জেলের অন্ধকার রিমান্ডে যে ছেলেটার নখ উপড়ে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যে রনি ভাই রাজপথে বুক চিতিয়ে পুলিশের বুলেট মোকাবিলা করেছেন—ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এত নম্র, এত অনুশাসিত আর শালীন কীভাবে?

পরদিন বিকেলে লাইব্রেরির সামনে এক সহপাঠীর মারফতে জানা গেল আসল সত্যটা। রনি কেবল হঠাৎ-গড়ে-ওঠা কোনো আবেগীয় ছাত্রনেতা নন; তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের একজন নিবেদিতপ্রাণ ও সুশৃঙ্খল কর্মী। রনির নির্যাতন সহ্য করার পেছনের মূল ভিত্তিই ছিল তার এই আদর্শিক শিক্ষা।

খবরটা শুনে প্রথমে থমকে গিয়েছিল সৈকত। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখের সামনে অনেকগুলো হিসেব মিলে গেল।

সৈকত বুঝতে পারল—কেন হাজারও নির্যাতন আর রাজপথের উত্তেজনার মাঝেও রনির মুখ থেকে কখনো একটাও অশ্লীল বাক্য বের হয়নি। কেন এত নারী শিক্ষার্থীর নিঃশব্দ আকুলতা ও অগাধ মুগ্ধতা থাকা সত্ত্বেও রনির দৃষ্টি সবসময় থাকত অবনত ও শালীন। ধূমপান বা কোনো নেশার ছোঁয়া যার চরিত্রকে স্পর্শ করতে পারেনি, যার সততা নিয়ে বিরোধী দলের চরম শত্রুও কখনো প্রশ্ন তুলতে পারেনি—তার এই অসাধারণ চরিত্র তো কেবল সেই সুশৃঙ্খল আদর্শেরই সুফল।

সন্ধ্যায় ক্যাফেটেরিয়ার সামনে রনিকে দেখে সৈকত ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।

"রনি ভাই," সৈকত একটু আবেগপ্লুত গলায় বলল, "আপনার রিমান্ডের কষ্ট আর রাজপথের সাহসিকতা তো দেখেছি। কিন্তু আজ জানলাম আপনার এই অপরাজেয় ধৈর্য আর উন্নত চরিত্রের আসল রহস্য। আমি সত্যিই অবাক হয়েছি।"

রনি মৃদু হেসে সৈকতের কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল, "সৈকত, নির্যাতন মানুষকে ভেঙে ফেলে যদি তার ভেতরে কোনো মজবুত ভিত্তি না থাকে। আর আমাদের আদর্শ শেখায়—ক্ষমতা বা পদের চেয়ে মানুষের চরিত্র ও আমানত রক্ষা করাই বড় কথা। আমরা দল-মত নির্বিশেষে সবার কল্যাণে কাজ করতে চাই।"

রনির শান্ত কিন্তু গভীর কথাগুলো শুনে সৈকত এক অদ্ভুত সত্য উপলব্ধি করল। রাজনৈতির ময়দানে মতপার্থক্য কিংবা হাজারো প্রচারণা থাকতে পারে, কিন্তু জুলুমের মুখে যে চরিত্র নুয়ে পড়ে না এবং বিজয়ের আলোতেও যে মানুষ নিজের নৈতিকতা ও নম্রতা হারিয়ে ফেলে না—সেই খাঁটি আদর্শ আর ব্যক্তিত্বই মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন তৈরি করে নেয়।

July 21, 2021     |     100 Comments

Please login for comment
Login

7 Comments

Lorem ipsum dolor sit amet, ut qui commodo sensibus, id utinam inermis constituto vim. In nam dolorum interesset, per fierent ponderum ea. Eos aperiri feugiat democritum ne.
200