I'm
ট্রাকনাচ ও বামপন্থী রাজনীতি
Date : Sept. 16, 2026, 6:13 p.m.
Blogger Name: আবু হাসান তাহের
ট্রাকনাচ ও বামপন্থী রাজনীতি
আবু হাসান তাহের
--------------------
নওয়াবপুর মোড়ের ‘বিপ্লবী লিকার টি-স্টল’-এ চশমার ফ্রেমটা নাকের ডগায় নামিয়ে হাঁক ছাড়লেন কমরেড বিপ্লব চ্যাটার্জি। এক হাতে গ্রামসির ‘হেজেমনি’ সম্পর্কিত ঢাউস বই, অন্য হাতে বিআরটিসির বাসের মতো ধোঁয়া ছড়ানো বুর্জোয়া ব্র্যান্ডের দামি সিগারেট।
পার্শ্ববর্তী চেয়ারে বসা তরুণ ক্যাডার প্রদীপ আর তত্ত্ববিদ ফরহাদ ভাই হাঁ করে কমরেড বিপ্লবের প্রতিটা শব্দ গিলছিল।
"বুঝেছ প্রদীপ? সাবজেক্টিভিটি আর ডায়ালেকটিকাল মেটেরিয়ালিজম না বুঝলে প্রলেতারিয়েতদের মুক্ত করা সম্ভব না! বুর্জোয়া শ্রেণির হেজেমনি ভাঙতে হলে আমাদের এজেন্সির সঠিক ব্যবহার করতে হবে!" — বিপ্লবদা চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে বেশ ভারী গলায় বাণী দিলেন।
ঠিক তখনই সাইকেলের বেল বাজিয়ে দোকানে প্রবেশ করলেন পাড়ার প্রবীণ কমরেড ‘অ্যান্টি-ক্যাপিটালিস্ট’ জলিল ভাই। জলিল ভাইয়ের আবার খাসলত হলো, নীতিতে তিনি চরম সাম্যবাদী হলেও পকেটে থাকে লেটেস্ট আইফোন, আর নিজের এক ডজন ফ্লাটের ভাড়া তুলতে তিনি কোনো আপস করেন না।
জলিল ভাই চায়ের অর্ডার দিয়ে বিপ্লবদার দিকে তাকিয়ে কপট আফসোস করে বললেন, "বিপ্লব, গত সপ্তাহে তো সরকারদলীয় র্যালিতে তোমাকে ঢোল বাজিয়ে নাচতে দেখলাম? আর তার আগেরবার যখন বিরোধী দল জিতল, তখন তো তুমি নিজে চাঁদা তুলে ট্রাক ভাড়া করে সাউন্ড সিস্টেমে ডিজে গান বাজিয়ে নেচে এলে! প্রলেতারিয়াতের বিপ্লব কি তবে ট্রাাকের ওপরেই শেষ হলো?"
প্রদীপ খাতা বের করে নোট নিচ্ছিল। প্রশ্নটা শুনে সেও কৌতূহল সামলাতে না পেরে বলল, "বিপ্লবদা, আসলেই তো! আমরা ক্যাডাররা এত তত্ত্ব পড়ি, অথচ ক্ষমতা বদলালেই আপনার নাচের স্টাইল বদলে যায় কেন?"
বিপ্লবদা এক মুহূর্ত থতমত খেলেন। তবে বামপন্থী নেতা বলে কথা! তত্ত্বের অভাব নেই। চশমাটা পুছতে পুছতে বললেন, "আরে ভাই, ওটা তো ছিল সাবঅল্টার্নদের সাইকোলজি স্টাডি করার জন্য ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টিসিপেশন’! তোমরা রবীন্দ্রনাথের ‘জমিদার’ চরিত্রগুলো পড়ো নাই? উনি যেমন প্রজাদের সাইকি ধরে রেখেছিলেন, আমরাও ঠিক তেমনি মাস-পলিটিক্সের সাবজেক্টিভিটি অ্যানালাইস করছিলাম! রবীন্দ্রনাথ তো আমাদের পূজনীয় মহাপুরুষ, তাই না?"
এমন সময় দোকানের কোণে বসে বিড়ি ফুঁকতে থাকা ছাটাই হওয়া এককালের সুতা-কল শ্রমিক বুড়ো খলিল চাচা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। খলিল চাচা ব্রিটিশ আমল থেকে রাজনৈতিক মহড়া দেখে আসছেন।
"রাখো তো তোমার গ্রামসি আর রবীন্দ্রনাথ!" — খলিল চাচা বিড়ির ছাই ঝেড়ে বললেন, "তোমাদের এই পুতুলনাচ তো আমি সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। তোমাদের বাপ-দাদারা জমিদারদের সামনে দুই হাত জোর করে 'হুজুর' 'হুজুর' করে সালাম ঠুকতে ঠুকতে জীবন কাটাল। তারপর তোমরা এলে বুর্জোয়াদের ড্রইংরুমে বসে বিপ্লবের মুড়ি-চানাচুর খেতে! আর এখন যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তোমাগো নাচ থামে না। সুতা থাকে বুর্জোয়াদের হাতে, আর তোমরা মঞ্চে উঠে খেমটা নাচ নাচো!"
দোকানের আবহাওয়া গরম দেখে তত্ত্ববিদ ফরহাদ ভাই গম্ভীর মুখে ইন্টারভেন্ট করলেন, "খলিল ভাই, আপনি আমাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা বুর্জোয়া চশমা দিয়ে মূল্যায়ন করছেন! আমরা হচ্ছি ডায়ালেক্টিক্যাল প্রসেসের ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক!"
জলিল ভাই নিজের আইফোনে টু মারতে মারতে যোগ করলেন, "হ্যাঁ, তবে আমাদের এনজিও ফান্ডিং আর সেমিনারের বাজেট কিন্তু আবার সরকার ও পশ্চিমা এজেন্সির মুডের ওপর নির্ভর করে, হে হে!"
পাড়ার তরুণ তুর্কি আর উদীয়মান লেখক রফিক এতক্ষণ চুপচাপ ডায়েরিতে কী যেন লিখছিল। সে ডায়েরিটা ধপ করে টেবিলের ওপর রেখে সবার দিকে তাকাল।
"বিপ্লবদা! বাংলাদেশ বামপন্থী রাজনীতির সঠিক ইতিহাস নিয়ে আমি একটা গবেষণাগ্রন্থ লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রথম খণ্ডের প্রচ্ছদ চূড়ান্ত। নাম দিয়েছি: 'পুতুলনাচের ইতিকথা'!"
দোকানের সবাই একমুহূর্ত স্তব্ধ। বিপ্লবদা লাল হয়ে যাওয়া মুখ সামলে গর্জে উঠলেন, "এসব কী ফালতু নাম! ইতিহাস বিশ্লেষণ হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ ও তত্ত্বভিত্তিক!"
রফিক মুচকি হেসে খাতার পরবর্তী পাতা উল্টে বলল, "আহা দাদা, অত রেগে যাচ্ছেন কেন? ওটা তো বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার নাম। সামনে যদি ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয় আর অন্য দল জেতে, তবে আমরা তো আবার ট্রাক ভাড়া করব! তাই দ্বিতীয় সংস্করণের নাম আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছি— 'ট্রাকনাচ ও বামপন্থী রাজনীতি : ফ্যাক্ট নাকি ন্যারেটিভ?'!"
পুরা টি-স্টলে হাসির রোল উঠল। এমনকি জলিল ভাইও নিজের বুর্জোয়া হাসিকে সংবরণ করতে পারলেন না। আর বিপ্লবদা থমথমে মুখে হাতে থাকা হেগেলের ‘ফেনোমেনোলজি অফ স্পিরিট’ বইটা দিয়ে টেবিলের মাছি তাড়াতে লাগলেন।
July 21, 2021 | 100 Comments