I'm
রক্তে লেখা তিতুমীর হলের ২০৪ নম্বর কক্ষ
Date : Sept. 16, 2026, 6:09 p.m.
Blogger Name: আবু হাসান তাহের
রক্তে লেখা তিতুমীর হলের ২০৪ নম্বর কক্ষ
++++++++++++++++++++++++++++
রাত তিনটা পাঁচ।
তিতুমীর হলের ২০৪ নম্বর কক্ষটির দরজার বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার কোনো শব্দ নেই। থমথমে নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে বুয়েটের পুরো ক্যাম্পাসে। ভেতরের আলো-আঁধারির খেলায় দেয়ালজুড়ে বিকৃত কিছু ছায়া কাঁপছে। বাতাসে তখন লোনা রক্তের গন্ধ আর হিংস্র কিছু পশুর ভারী শ্বাসের শব্দ।
মেঝেতে পড়ে আছে একটা চটের বস্তা। আর সেই বস্তার ভেতরে বন্দি একটা তরুণ শরীর—যার প্রতিটা শ্বাসের সাথে বুকের পাঁজর শত টুকরো হয়ে যাওয়ার তীব্র কষ্ট। বাইরে ঢাকা শহর তখন এক আতঙ্কের উপত্যকা। আর ভেতরে চলছে এক নিরপরাধ তরুণকে পিটিয়ে ছাতু করার উৎসব।
বস্তার মুখটা এক ঝটকায় খুলে দিল ১১ ব্যাচের তানভীর রায়হান আর ১০ ব্যাচের শাহাদাত হোসেন রাসেল। ওপরে দাঁড়িয়ে হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে ০৯ ব্যাচের সিয়াম হোসেন ও ১০ ব্যাচের আবু সাঈদ কনক। সিয়ামের হাতে কাঠের থিকথিকে ক্রিকেট ব্যাট, কনকের হাতে মোটা জিয়াই পাইপ।
"বল, তোর ভাই কোন মেসে মিটিং করে? তোর ভাই কটা ফেসবুক পোস্ট লিখছে আজকে?"— গর্জে উঠল কনক।
আনোয়ার শুধু হাঁপাচ্ছিল। মুখ দিয়ে নাল আর রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে কোনো রাজনৈতিক কর্মী নয়, কোনো মিছিলের অগ্রভাগে সে কখনো ছিল না। তার একমাত্র অপরাধ—সে তার ভাইয়ের ভাই।
গল্পটা কিন্তু এই অন্ধকার টর্চার সেলে শুরু হয়নি। গল্পটার শুরু হয়েছিল শৈশবের যৌথ স্বপ্নের সীমানায়। দুই মামাতো ভাই, কিন্তু বেড়ে ওঠা যেন একই মায়ের দুই নাড়িছেঁড়া ধন হয়ে। আম্মুর কড়া শাসন আর মামীর পরম স্নেহের ছায়ায় গড়ে ওঠা সেই দিনগুলোতে দুজনের পছন্দ-অপছন্দ, চাওয়া- পাওয়া ছিল অবিকল এক। চোখের কোণে একটাই ধ্রুবতারা—বুয়েট।
২০১০ সালে বড় ভাই হিসেবে প্রথম সেই স্বপ্নের দরজায় পা রাখেন। আনোয়ার ছিল এক বছরের ছোট। কিন্তু ঠিক যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার দিনগুলো ঘনিয়ে আসছিল, তখনই ওর শরীরে হানা দিল এক নিষ্ঠুর অদৃশ্য ঘাতক—মারাত্মক বাতের ব্যথা। ব্যথা বাড়লে নাকি নিশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যেত, বিছানা থেকে ওঠা তো দূরের কথা। প্রথমবার পরীক্ষা খারাপ হলো, ভর্তি হলো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু যার চোখে বুয়েটের লাল ইটের দালানের স্বপ্ন, তাকে কি আর ব্যথার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা যায়?
পরের বছর তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে, শরীরে হাজারো কষ্ট চেপে ২০১২ ব্যাচের সাথে ঠিকই বুয়েটের রক্তিম তোরণ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল সে। অন্য যেকোনো বিষয় নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ভাইয়ের পথ ধরে বেছে নিল ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (MME)। শুধু তা-ই নয়, ভাইয়ের মতোই নিজের যোগ্যতায় ক্লাসের রিপ্রেজেন্টেটিভ নির্বাচিত হলো।
কিন্তু ততদিনে ঢাকার আকাশ ভেঙে নামছিল এক ভয়াবহ রাজনৈতিক অমাবস্যা।
সেটা ২০১৪-১৫ সালের সময়। ঢাকা শহর তখন এক বিশাল খোলা কারাগার। তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পেটোয়া বাহিনী আর পুলিশের হাতে বুড়িগঙ্গার জল যেমন বিষাক্ত হচ্ছিল, তেমনি শাহবাগ, টিএসসি থেকে শুরু করে বুয়েট-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রাতে রূপ নিত আতঙ্কের উপত্যকায়। পুলিশের সাঁজোয়া যান 'অ্যাসল্ট ভেহিক্যাল' রাজপথে টহল দিত, আর সাধারণ ছাত্রদের সামান্য সন্দেহ হলেই তুলে নিয়ে যাওয়া হতো ডিবি কার্যালয় কিংবা গোপন কোনো টর্চার সেলে। রাতে শাহবাগ বা নীলক্ষেত মোড়ে পুলিশি চেকপোস্টে ব্যাগ তল্লাশির নামে চলত চরম হেনস্তা। ফোনে একটা নির্দিষ্ট ধারার অ্যাপ বা মেসেজ পেলেই কপালে জুটত 'জঙ্গি' বা 'রাষ্ট্রদ্রোহী'র সিল। রাজপথে কোনো মিছিল হলেই টিয়ারশেল, ছররা গুলি আর নির্বিচারে গ্রেফতার ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য।
এই হিংস্র পলিটিক্যাল কালচারের ছায়া এসে পড়েছিল বুয়েটের সবুজ ক্যাম্পাসেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাকস্বাধীনতা রক্ষা ও সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অপরাধে বড় ভাইকে ছাত্রলীগ 'শিবির' ট্যাগ দিয়ে রেখেছিল।
তিতুমীর হলে আনোয়ারের নামে কোনো সিট ছিল না। শেরে বাংলা হলে বড় ভাইয়ের ছোট্ট একটা সিটে দুজন কষ্টে দিন পার করছিলেন। কিন্তু বড় ভাইয়ের মনে তাড়া করছিল এক অদ্ভুত ভয়—“আমার কারণে যদি ছোট ভাইটার গায়ে কোনো আঁচ লাগে?” এই ভয় থেকেই বড় ভাই বারবার পাঠাতেন তিতুমীর হলের প্রভোস্টের কাছে, একটা বৈধ সিটের আকুতি নিয়ে। কিন্তু সিট মেলেনি। মিলেছিল মৃত্যুর উপত্যকা।
কমিটিতে বড় পদ পাওয়ার মোহে অন্ধ হয়ে তানভীর আর রাসেল একদিন তিতুমীর হলের টর্চার সেলে ধরে নিয়ে গেল আনোয়ারকে। কয়েক ঘণ্টা ধরে বস্তাবন্দি করে রাখা হলো তাকে। সিয়াম আর কনকের নির্দেশে দফায় দফায় রড, স্টাম্প আর পাইপ দিয়ে পেটানো হলো আনোয়ারকে। প্রতিটা আঘাতের শব্দে মনে হচ্ছিল একটা করে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
২০১৪-১৫ সালের তিতুমীর হল মানেই ছিল এক চরম ট্রমা আর ভীতি। বড় ভাইয়ের মনে হতো, বুয়েটের টর্চার সেলে যদি কেউ মরে, তবে সেটা তিতুমীর আসলেই ঘটবে। যদিও এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে ২০১৯ সালে শেরে বাংলা হল ছাত্রলীগ আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে শহীদ করেছিল।
আনোয়ার সেদিন তিতুমীর হলের নরক থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরলেও, সেই নির্যাতন তার সুপ্ত বাতের ব্যাথায় যেন বিষ ঢেলে দিল। হাড়ের ভেতরে ঢুকে গেল এক স্থায়ী ট্রমা। পরবর্তী প্রতিটি দিন তার জন্য হয়ে উঠল এক একটি যুদ্ধ। রাতের পর রাত সে যন্ত্রণায় ছটফট করত, হলের বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবত—তার অপরাধ কী ছিল?
কয়েকটি বছর কাটল ক্লাসে যেতে না পেরে, ঘরের কোণে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করে। বুয়েট থেকে তার পাস করে বের হওয়ার আশা পরিবার একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছিল।
গত ১৫ বছরে ঢাকার রাজপথ দেখেছে হাজারও গুম, গুটিকয়েক আয়নাঘরের অন্ধকার আর অসংখ্য লাশের মিছিল। ফ্যাসিবাদী রাজত্বের সেই মহাসমুদ্রে এক তরুণ আনোয়ারের হারিয়ে যাওয়া ১৪টি বছর হয়তো সামান্য এক আঁচড় ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতা সাক্ষী দেয়—এই আঁচড়গুলোর পেছনে জমে আছে এক একটি পরিবারের কান্না, আর এক একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু।
একসময় বড় ভাই হিসেবে আবেগের মাথায় আনোয়ারকে বলা হয়েছিল, “আনোয়ার, এই সার্টিফিকেটের আর কোনো প্রয়োজন নেই। এ সার্টিফিকেট দিয়ে কী হবে? জীবন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাও।”
আজ ১৪টি বছর পর, ফ্যাসিবাদ আর রাজনৈতিক নির্যাতনের সেই বিষাক্ত চাদর ছিঁড়ে যখন আনোয়ার বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হলো—আজ স্পষ্ট বোঝা যায়, সেদিন বড় ভাই ভুল ছিলেন। সঠিক ছিল আনোয়ারের সেই অদম্য জেদ, তার অপরাজিত আত্মসম্মান।
এটা তো শুধু একটা কাগজের সনদ নয়; এটি ছিল এক স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মুখে চড় মারা এক অপরাজেয় প্রতিজ্ঞা। এটি ছিল এক অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার দীর্ঘ ১৪ বছরের রক্তক্ষয়ী নীরব প্রতিবাদ।
আজ ইতিহাস থমকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় আনোয়ারকে। ভাই আমার, তোমার এই জেদ, সংগ্রাম আর রক্তের কালিতে লেখা বিজয়ের কাছে গোটা দেশ আজ মাথা নোয়ায়।
July 21, 2021 | 100 Comments